TT Ads

খান শরীফুজ্জামান

রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, দায়দায়িত্ব, শাস্তি, ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে, সভা-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যেই আরও জোরদার হয়েছে বাংলাদেশকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি-সুবিধা প্রত্যাহারের হুমকি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের টিকফা (ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট) চুক্তি স্বাক্ষরের চাপ।

টিকফা চুক্তি কী ফল বয়ে আনবে
টিকফা আসলে কী, এটা আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত কোনো চুক্তি কি না। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো হয়, সেগুলো মূলত তিন ধরনের তাড়না থেকে হয়। সেগুলো হলো- অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাড়না, কৌশলগত তাড়না আর সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যবিষয়ক ও ঘটনাকেন্দ্রিক তাড়না। সরকার যে চুক্তিটা করতে যাচ্ছে, সেটার কোনো খসড়া প্রকাশ করেনি। তাই নির্দিষ্টভাবে আলোচনা করা যাচ্ছে না। তবে পৃথিবীর অন্য যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতোমধ্যে সম্পাদিত এ ধরনের যে চুক্তিগুলো আছে, সেগুলো পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট যে টিকফা কিংবা টিফা আসলে দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। অর্থাৎ এটা কৌশলগত একটি চুক্তি। এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্বার্থ এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সম্পাদিত হয়। এ ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের যে নিজস্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইনি এবং মানগত কাঠামো রয়েছে, সেগুলোকে তারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়। অথচ এ ধরনের সমঝোতা কাঠামোতে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকে না। যেসব বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, সেসব বিষয়ে বাংলাদেশের কর্মপন্থা ও অবস্থান কী হবে তারই একটি প্রাক-নির্ধারণ হচ্ছে এই টিকফা।

বাংলাদেশে টিকফার ইতিহাস
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর থেকে মার্কিনরা সরকারের ওপর টিফা চুক্তি সই করার জন্য চাপ প্রয়োগ শুরু করে। এ জন্য তৎকালীন সরকারের সঙ্গে মার্কিনদের দেনদরবারও হয়। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া আলাপ চলতে থাকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত। তবে সেবার বিএনপি সরকার টিফা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় বাম ও কিছু ইসলামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ব্যাপক বিরোধিতার কারণে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও টিফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করা থেকে পিছিয়ে আসে জনমত টিফার বিপক্ষে থাকার কারণে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ থাকা টিফা চুক্তির ব্যাপারে আলাপ শুরু হয়। এ আলাপে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি নাম পরিবর্তন করে টিফা চুক্তি করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। টিফা বা টিকফা যে নামেই হোক, এ চুক্তির মধ্যে কী ধরনের শর্ত রয়েছে, সে সম্পর্কে দেশের মানুষের কোনো ধারণা নেই। কারণ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সমান গুরুত্ব দিয়ে গোপন রেখেছে। টিফা নিয়ে বাংলাদেশের সরকারগুলোর এ রকম গোপনীয়তার কারণে জনগণের মধ্যে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের হাতে আছে ২০০৫ সালে প্রস্তাবিত ঞওঋঅ-এর খসড়া। এই খসড়া টিফার সঙ্গে কী সংযোজন হবে আর কী বিয়োজন হবে, তাও নির্দিষ্ট করে বলা হচ্ছে না সরকারের পক্ষ থেকে।

সামরিক কৌশল
বাণিজ্য চুক্তির আড়ালে টিকফা বা টিফার সামরিক গুরুত্ব রয়েছে। ভূ-কৌশলগত দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গোপসাগর মার্কিন প্রভাবে রাখার জন্য টিফার সামরিক গুরুত্ব রয়েছে। চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকের পরই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যায়। মার্কিনদের চীন ঘেরাও নীতির ফলে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে পশ্চিমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক স্থান।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও শুধু বাণিজ্যই এসব দ্বিপক্ষীয় চুক্তির একমাত্র লক্ষ্য নয়, ভূ-রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে মার্কিনদের প্রভাব বিস্তার করাও এসব চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য। টিফা বা টিকফা চুক্তি করার মূল কারণ এখানে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি এবং জিএমও প্রবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল চেষ্টা রয়েছে। জিএমও বায়োলজিক্যাল উইপন সিস্টেম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নতুন ক্ষেত্র। আবার অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পরীক্ষাগার বানাতে চায়। আর এ ধরনের কৌশলগত তাড়না থেকে উৎসারিত চুক্তি কেবল বাণিজ্য সম্পর্কিত বিষয়ে জড়িত নয়, এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট স্বার্থও জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে যুক্তরাষ্ট্র যেসব রাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে এই যুদ্ধ চালাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থের সঙ্গে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট স্বার্থও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

সরকার কেন চুক্তির খসড়া প্রকাশ করছে না
যখন এ ধরনের চুক্তিতে জনমানুষের স্বার্থ রক্ষা করা হয় না, তখনই অস্বচ্ছতা তৈরি হয়। সামনে নির্বাচন। তাই এ ধরনের চুক্তি প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সমালোচনার সম্মুখীন হতে পারে, সেই ভীতিটা তো সব সরকারের জন্যই থাকে। এই অস্বচ্ছতা দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় খুব স্বস্তিদায়ক নয়।

চুক্তি হলে কী ধরনের অসুবিধার মধ্যে পড়ব
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাজার উন্মুক্ত করার ব্যাপারে আমাদের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটাই এই বহুপক্ষীয় দরকষাকষি ফোরামের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উন্নয়নশীল সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা যে ছাড়গুলো স্বাভাবিকভাবে পেয়ে থাকি, সেগুলো থেকে আমরা বঞ্চিত হব। উপরন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আলোচনায় আমাদের এক ধরনের দ্বৈত অবস্থান তৈরি হবে। এ সংস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে অবস্থান নিয়ে আমরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করি অথবা মেধাস্বত্ব অধিকার, লেবার স্ট্যান্ডার্ড বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের যে ঐতিহ্যগত অবস্থান, তা এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কারণে অনেক নড়বড়ে হয়ে পড়বে। দ্বিপক্ষীয় না বহুপক্ষীয়- দীর্ঘমেয়াদে কোন অবস্থানকে আমরা গুরুত্ব দেব, সেটা আমাদের বিবেচনা করা খুব জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র যখন এই জাতীয় চুক্তিগুলো করে, তখন সেটা পুরো মাত্রায় তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্যই মূলত করে।

বাণিজ্যিক সুবিধার মিথ্যা তথ্য
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছে, টিকফা চুক্তির মধ্যেও এই বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ওপর আরোপিত উচ্চহারে শুল্ক কমিয়ে তাদের গড় শুল্কহারেরও সমান করে, তাতে যে পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হবে, তাতে ৪০ লাখ শ্রমিকের মজুরি তিন মাস অতিরিক্ত শোধ করেও নিরাপত্তাজনিত সব ব্যয় বহন সম্ভব হবে। বলা হচ্ছে, টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের উন্নতি হবে। বাংলাদেশের দিক থেকে এই উন্নতির অর্থ কী এই যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চরম বৈষম্যমূলক ও সংরক্ষণবাদী শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্র পরিবর্তন করবে? মার্কিন কোম্পানি শেভরনের কাছে মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশের পাওনা ২০ হাজার কোটি টাকা কি শোধ করার ব্যবস্থা করবে? সব সামরিক-বেসামরিক চুক্তি কি জনগণের কাছে প্রকাশ করবে? এগুলোর বিষয়ে কোনো কথা নেই চুক্তিতে। কোনো সরকারের মুখে এই কথাটা কেন আসে না যে আমাদের বিশেষ সুবিধা দিতে হবে না। আন্তর্জাতিক রীতিনীতিবিরোধী বৈষম্যমূলক সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য ব্যবস্থা তোমরা বাতিল কর।
মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএন ‘ইনস্টিটিউট ফর গোবাল লেবার অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর গবেষণা থেকে হিসাব করে দেখিয়েছে, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পোশাক যে দামে বিক্রি হয়, তার শতকরা ৬০ ভাগই পায় সে দেশের বায়ার ও বিখ্যাত ব্র্যান্ড বিক্রেতারা, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বাকি ৪০ ভাগের মধ্যে উৎপাদন প্যাকেজ ও পরিবহন খরচ এবং মালিকের মুনাফা অন্তর্ভুক্ত। শ্রমিকের মজুরি একেবারে তলায়, শতকরা ১ ভাগেরও কম।

শেষ কথা
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র টিফা করতে পারেনি। অথচ ওই সব দেশের সঙ্গে মার্কিনদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্যসম্পর্ক। এসব দেশের তালিকায় রয়েছে কানাডা, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতের মতো দেশগুলো। টিফা আসলে সেই সব দেশের সঙ্গে করা হয়, যেসব দেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো দেশের সঙ্গে টিফা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তার কোনোটির সঙ্গেই কিন্তু সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যকেন্দ্রিক নয়। এর বাইরে সামরিক ও ভূ-কৌশলগত বিষয়টি রয়েছে।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *
You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>