TT Ads

১৪ আগস্ট ২০১৩ মুসলিম বিশ্ব দেখল মুসলিমদের রক্তে নীলনদ কীভাবে লালনদ হয়ে উঠল। কীভাবে নীলনদের ধারার সাথে মুসলিম সন্ত্রাসীদের (ধর্মনিরপেক্ষ ও পশ্চিমা মোড়লদের মতে) রক্ত ধারা বয়ে গেল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য আরো একবার মুসলিমরা এপ্রিল ফুলের মতো গণতন্ত্রের ফুলে পরিণত হলো। তিন তিন বার নির্বাচনের পরীক্ষা দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েও মডারেট মুসলিম ব্রাদারহুড শেষ রক্ষা পেল না। আরব বসন্তের গর্ভে জন্ম নেয়া মুরসিকে বিতাড়িত করে সেই স্বৈরতান্ত্রিক ফেরাউন মোবারককে মুক্ত করে পুরস্কৃত করা হলো। এমন ঘটনার পর মুসলিম বিশ্বের আজকের তরুণরা যদি গণতন্ত্রের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বাকি বিশ্বকে তা হাসি মুখেই গ্রহণ করতে হবে। যে কোনো পন্থা ও ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মানবিক অধিকার তরুণদের রয়েছে। আমরা ৯০-এর দশকে আলজেরিয়ায় দেখেছি, ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ার পরও সেনাবাহিনী সে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং লিয়ামেন জেরুয়ালের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। লিয়ামিন জেরুয়াল তিন দশক ধরে দেশটিতে একদলীয় শাসন কায়েম করে রেখেছে। নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেয়ার ফল হিসেবে আলজেরিয়ায় জনগণকে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের মুখে পড়তে হয়েছে।

মুসলিম বিশ্বের সর্বশেষ রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক ছিল উসমানিয় খিলাফত। ১৯২৪ সাল নাগাদ মুসলিমদের রাজনৈতিক উদাসীনতা ও দীর্ঘমেয়াদী পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কারণে ভেঙে পড়ে খিলাফত ব্যবস্থা। খিলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্বে সৃষ্টি হয় ”ভ্যাকুম অব পলিটিক্যাল সিস্টেম এন্ড পলিটিক্যাল লিডারশিপ”। ফলে শুরু হয় সামরিক শাসন, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও সর্বশেষে পুতুল সরকার ব্যবস্থা। মূলত নির্বাচন হলো পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বোচ্চ সংগঠন রাষ্ট্রের নেতা খুেঁজ বের করার একটি উপায়। যা একটি পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ইসলামী ব্যবস্থা তথা সকল ব্যবস্থার মধ্যেই গ্রহণযোগ্য নেতা নির্বাচনের একটি উপকরণমাত্র। ইলেকশন কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার আদর্শ নয়।

তবে আধুনিক ও বর্তমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সকলেই একমত যে, ইলেকশন অনুষ্ঠিত হলেই একটি জাতিকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। মূলত প্রচলিত পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের উত্পত্তি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ থেকে। আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ থেকে উত্সারিত হয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব তথা জনগণের সার্বভৌমত্ব। সর্বোপরি উদারবাদী চিন্তা-ভাবনার উন্মেষ ঘটেছে রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক জীবনেও। এসবের সম্মিলিত প্যাকেজই আজকের আধুনিক পুঁজিবাদ যা ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’, ‘বিশ্বায়নে’র মতো বিভিন্ন নতুন নতুন নামে বিশ্বব্যবস্থায় বাজারজাতকরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভিন্ন বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির ধারক মুসলিমরা তাদের আদর্শে অনড় ও শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। ইরাক অথবা আফগানিস্তানের মানুষ কখনোই বিশ্বাস করে না পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে। ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির সংঘাত আজ মুসলিমসহ সারা বিশ্বে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এছাড়া মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের সফলতার কথা তুললে অনেকেই মালয়েশিয়া ও তুরস্কের কথা উল্লেখ করে। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার উন্নতি হয়েছে মূলত মাহাথির মুহম্মদের এক ধরনের একনায়কত্বের শাসনামলে। বাকি থাকল তুরস্ক। সেখানের সেকুলারাইজেশন প্রজেক্টও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি। গত প্রায় এক দশক সেখানেও ইসলামপন্থিরাই ক্ষমতায় আছে। এই এ.কে পার্টির বিরুদ্ধে সেখানের সেকুলাররা প্রায়ই দাবি তোলে, দলটি নাকি আবার উসমানীয় ঢংয়ের শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

উসমানিয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলো থেকে সম্পদ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য বৃটিশ-ফ্রান্স-আমেরিকা কখনো স্বৈরশাসক আবার কখনো সেনাবাহিনীকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। জামাল আব্দুল নাসের, ইসলাম কারিমভ, হোসনে জাইম, করিম কাসেম, হাফিজ আল আসাদ, জেনারেল সুহার্তো, সাদ্দাম, সৌদ বংশের শাসকগণ, রেজা শাহ পাহলভী, গাদ্দাফি, মোবারক, আইয়ুব খান, জিয়াউল হক, মোশাররফদের মতো বর্তমান ও সাবেক স্বৈরশাসকরা আমেরিকা-বৃটেনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে টিকে আছে, টিকে ছিল।

কিছু বড় ইসলামী দল রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তাই বিশ্বের বহু দেশে তাদের শাখা বা সংগঠন থাকা সত্ত্বেও তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না। মুসলিম বিশ্বের সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী সবগুলোর কোনোটিই ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। যে দলগুলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তারা নির্বাচনকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহণে একটি মাধ্যম বা হিকমা হিসাবে মনে করে।

আরব বিশ্বে মুসলিম তরুণরা স্বৈরতন্ত্রের জিঞ্জির হতে মুক্তির জন্য যে বিপ্লবের সূচনা করেছিল সে মুক্তির স্বপ্নভঙ্গ হলে তারা চরমপন্থার দিকে পা বাড়াতে পারে। ব্রাদারহুড তথা মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সামনেও বড় প্রশ্ন থাকবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচন কী তাদের ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী? নাকি পশ্চিমা সেকুলার পুঁজিবাদী বিশ্ব চায়, ইসলামপন্থিরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করুক কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ইসলামী আদর্শ যেন বাস্তবায়ন না করে। ঐতিহাসিক ও আদর্শিক এ দ্বন্দ্বের অভিজ্ঞতা মনে হয় ইসলাম ও পুঁজিবাদী সেকুলার গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ সম্পর্কের রূপ নির্ধারণ করবে।

 

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *
You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>