Friday , March 22 2019
Home / Islamic Issue / ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের এক দশক

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের এক দশক

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক ম্যাকিয়াভেলির বিখ্যাত উক্তি ছিল, জোর যার মুলুক তার। পুঁজিবাদী আমেরিকার এই মুলুক দখলের রাজনীতির ফলে ইরাক পরিণত হয়েছে ইতিহাসের মহাশ্মশানে। ইরাক বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী আরব দেশ। প্রাচীন সভ্যতার অহংকার নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এর অবস্থান। হাজার বছর ধরে যে মেসোপটেমিয়া অঞ্চল মানব সভ্যতাকে ধারণ করে আছে, আজ তা ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সংঘাতের জনপদ। অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম বা ইরাক মুক্ত করার নামে ২০০৩ সালের ২০ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল, এই একুশ দিন ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর ৩ লাখ সেনা হামলে পড়ে ইরাকের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। আর মুসলিম বিশ্বকে বুঝিয়ে দেয় পশ্চিমা স্বাধীনতা কাকে বলে! নির্বিচার বোমাবর্ষণে, গুচ্ছ বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় শিশুদের শরীর, নিহত হয় হাজার হাজার ইরাকি জনগণ। ফোরাত নদীর তীরে, কারবালার প্রান্তরে প্রান্তরে একবিংশ শতকের বুশ-ব্লেয়ার নামক সীমারের হাতে বিপর্যস্ত হয় সত্য, ন্যায়, মানবতা ও মানবাধিকার। জাতিসংঘ, ওআইসিসহ বাকি বিশ্ব নির্বাক চেয়ে থাকে। এর বিপরীতে আমেরিকার দাবি- মিশন সফল হয়েছে। ইরাকে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতন্ত্র। ইরাকের মানুষ আজ মুক্ত।

ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সরকারের খরচ হয়েছে দুই ট্রিলিয়নের বেশি ডলার। আর জীবনহানি হয়েছে এক লাখ ৮৯ হাজার। ইঙ্গ-মার্কিন নিয়ন্ত্রিত বহুজাতিক বাহিনী ইরাকে যে নৃশংস মানবিক বিপর্যয় ঘটায়, তার অন্যতম হোতা ছিল জাতিসংঘ। সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে সভ্যতার লীলাভূমি ইরাককে পঙ্গু করে দেয়া হয়। অবরোধের জন্য জাতিসংঘে পাস হয় রেজ্যুলেশন ১৪৪১। ইউনিসেফের তথ্য মতে, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত পাঁচ লাখ ইরাকি শিশু মারা যায়।

আজ এক দশক পর বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কার- আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছিল মিথ্যা অজুহাতে। পুঁজিবাদীদের স্বার্থসর্বস্ব নীতিহীন রাজনীতির মুখোশ আজ মানুষের কাছে স্পষ্ট। আসলে তারা ভালো করেই জানত সাদ্দাম হোসেনের কাছে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র (গউড) নেই। জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক দলের প্রধান হ্যান্স বিক্স ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি এজেন্সির প্রধান মোহাম্মদ এল বারাদির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ইরাকের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী কোনো অস্ত্র নেই। আমেরিকা ও পশ্চিমা মিত্রদের ইরাক যুদ্ধের প্রকৃত কারণ ২০০১-এর জ্বালানি নিরাপত্তা রিপোর্ট পড়লেই বোঝা যায়। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির এ রিপোর্টে হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাদ্দাম হোসেন হুমকিস্বরূপ। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার নোবেল বিজয়ী নোয়াম চমস্কি বলেন, আমেরিকার ইরাক আক্রমণ আমাদের ষড়যন্ত্র তত্ত্বেরই বাস্তবায়ন। প্রতিটি মানুষের কাছেই পরিষ্কার, আমরা আমাদের গণতন্ত্রপ্রীতির জন্য ইরাক আক্রমণ করিনি। প্রকৃত কারণ ছিল, ইরাক পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল মজুদকারী।

২০১০ সালের নির্বাচনের পর থেকে ইরাকজুড়ে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার মূলে রয়েছে গোষ্ঠীগত বিভাজন থেকে সৃষ্ট সংঘাত ও হামলা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াদ আলাওয়ির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল মুভমেন্ট ২০১০ সালে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও কোনো জোট গঠন করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী নুরে আল মালিকির নেতৃত্বাধীন দল স্টেট অব ল অ্যালায়েন্স ও ন্যাশনাল ইরাকি অ্যালায়েন্স এই দুটি ইরানপন্থী জোট সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী মালিকি তাদের সম্প্রদায়গত অবস্থান আরও শক্ত করার জন্য তেল মন্ত্রণালয়, মিলিটারি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোয় তার অনুগতদের নিয়োগ করেন। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সুন্নিপন্থী উপ-প্রধানমন্ত্রী সালেহাল মুতলাককে তার ক্যাবিনেট থেকে বরখাস্ত করেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এই দুজনই ছিলেন সুন্নিপন্থী আল-ইরাকিয়ালিস্ট সংগঠনের সদস্য। এভাবে ইরান সমর্থিত শিয়া নেতা নুরে আল মালিকি তাদের সম্প্রদায়ের লোকজনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারে পাকাপোক্ত করতে চেষ্টা করেন। দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ উদ্ধার ও সম্পদ লুটপাটের জন্য আমেরিকা ১৭০০০ কর্মচারী ও সৈন্য-সামন্তের বিশাল দল নিয়ে তার দূতাবাস পরিচালনা করছে। আমেরিকা তার কৌশলগত স্বার্থরক্ষা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে এখনও ইরাক ছাড়ছে না। আর এ তেলসম্পদ লুণ্ঠনে আমেরিকাকে সাহায্য করছে মালিকি সরকার।

শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তন করে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রায়নের স্বপ্নও আজ ফিকে হতে বসেছে। সচেতন মানুষরা নিশ্চয় ইরাকের সেদিনের কথা ভুলে যাননি, যখন সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাদ্দাম হোসেনকে সহযোগিতা করে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল। সাদ্দাম শত শত ইরাকিকে হত্যা করেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় আমেরিকা দুই দেশের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করেছে। বিরোধ মীমাংসা না করে দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্নভাবে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এতদিনের পুরনো বন্ধুর প্রতি আমেরিকা সম্পূর্ণ চোখ উল্টে ফেলে। সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করলে আমেরিকা বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে মীরজাফরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পুরনো বন্ধু সাদ্দামের বুকে ছুরি চালায়। এখন পর্যন্ত ইরাকের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভাজন, বিভেদ ও সহিংসতার বীজ বপন করে আমেরিকা খলিফা হারুন-অর রশিদের সুসভ্য বাগদাদকে যেন আদিম যুগে পাঠিয়ে দিয়েছে।

About Khan Sarifuzzaman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

xu hướng thời trangPhunuso.vnshop giày nữgiày lười nữgiày thể thao nữthời trang f5Responsive WordPress Themenha cap 4 nong thongiay cao gotgiay nu 2015mau biet thu deptoc dephouse beautifulgiay the thao nugiay luoi nutạp chí phụ nữhardware resourcesshop giày lườithời trang nam hàn quốcgiày hàn quốcgiày nam 2015shop giày onlineáo sơ mi hàn quốcshop thời trang nam nữdiễn đàn người tiêu dùngdiễn đàn thời tranggiày thể thao nữ hcmphụ kiện thời trang giá rẻ