Friday , March 22 2019
Home / Academic Article / আগে বেতন বাড়ান, পরে কোচিং বন্ধ করুন

আগে বেতন বাড়ান, পরে কোচিং বন্ধ করুন

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কোচিং-বাণিজ্য অবশ্যই বন্ধ করতে হবে’ শিরোনামের লেখার সাথে কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছি। লেখায় বেশ কিছু স্ববিরোধী বক্তব্য রয়েছে।
শেখ জামাল উদ্দিন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। থাকেন ইব্রাহিমপুরের টিনশেড বস্তিতে। পরিবারের সদস্য মোট তিনজন। নিজেসহ এক মেয়ে ও স্ত্রী খাদিজা বেগম। এক রুমেই থাকেন মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে। তার মাসিক বেতন ৮৫০০ টাকা। বাসা ভাড়া দেন ৩০০০ টাকা। শুধু চাল কিনতেই খরচ হয় ১০০০ টাকা। এই মানুষ গড়ার কারিগরের সংসারের বাকি খরচ কিভাবে চলে তার ফিরিস্তি আর দিতে চাই না। তিনিও প্রাইভেট কোচিং করান। ব্যাচে তার স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর পাঁচজন ছাত্রকে পড়ান। ২০০ টাকা করে ১০০০ টাকা বাড়তি আয় করেন। তার এই আয়কে আমরা কিভাবে দেখব, নৈতিক না অনৈতিক?
আলোচ্য কলামিস্ট দেশব্যাপী ভালো ফলাফলের সাথে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মান উন্নত করার ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষের ভূমিকা জড়িত নয়। একাধিক বিষয় এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট, যা শুধু শিক্ষকের একার পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; যেমন কাঠামোগত ও অকাঠামোগত বিষয়গুলো। আর অংশগ্রহণমূলক আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান শুধু শিক্ষককে এখন জ্ঞানের উৎস হিসেবে বিবেচনা করে না। শিক্ষক হলেন পথপ্রদর্শক এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার পরিবেশ তৈরিকারক। তাই শুধু কোচিং বন্ধের সিদ্ধান্ত উন্নত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলবে না। বরং অর্থসঙ্কটে ভোগা শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আগে যা পড়াতেন, তার চেয়ে আরো বেশি অমনোযোগী থাকবেন।
‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’। তাহলে শিক্ষক জাতির কী! গ্রামে-শহরে শিক্ষকদের সামাজিক মূল্যায়ন বর্তমানে এতই কমে গেছে যে, আগের স্যার বা গুরুজির জায়গা দখল করেছে তাচ্ছিল্যপূর্ণ ‘মাস্টার’ অভিধা। শহরের ধনীরা মাসিক খরচের বিল হিসাবের সময় বুয়া, ঝাড়ুদার ও মাস্টারের বিলটা এক সাথে হিসাব করেন। ধনিক শ্রেণী বাসায় গিয়ে প্রতি বিকেলে খুব নমনীয়ভাবে কলবেল টিপতে কোনো শিক্ষকই চাইতেন না, যদি তাদের সংসার খরচের ন্যূনতম টাকাটা বেতনের টাকায় মিটত। আজকের পুঁজিবাদী সমাজে সামাজিক মূল্যায়নটাও ব্যক্তির সম্পদের ওপর নির্ভর করে। শিক্ষকেরাও চান বিকেলে এ শহরের বড়লোকদের মতো একটু জগিং করতে, বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘোরার শখ তাদেরও আছে। কিন’ তার বিকেল কাটে টিকে থাকার সংগ্রামে বড়লোকদের বাড়ি বাড়ি টিউশনি করে।
সরকার প্রাইভেট কোচিং বন্ধের আইন করছে। আমরাও চাই ছাপোষা ঘানিটানা জীবনের চক্র থেকে বের হয়ে আসতে। তবে এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিন বছর ধরে শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে, তার বাস্তবায়ন আমরা আগে দেখতে চাই। তা না হলে কোচিং বন্ধের আইন ও ধূমপান বন্ধের আইনের মতো নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হয়েছিলাম দেশ ও সমাজ গড়ার মহান ব্রত বুকে নিয়ে। কিন’ যখন দেখলাম আমি ও আমার বন্ধুরা প্রথম শ্রেণীতে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি দশম হয়েও লাভ হলো না। আমাদের এক সহপাঠী বন্ধু আঠারোতম হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে গেলেন, যার অনার্সের রেজাল্ট প্রথম ১০০ জনের মধ্যেও ছিল না, তবে তার বিশেষ যোগ্যতা ছিল। একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের কিছু প্রভাবশালী শিক্ষক ও ছাত্রনেতার সাথে ভালো যোগাযোগ ছিল। পাঠক, আপনারাই বিচার করুন, এ ধরনের ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’ শিক্ষকদের কাছ থেকে সরকার বা জনগণ কী মান আশা করতে পারে? এমন দুর্নীতি এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যন্ত সব নিয়োগের ক্ষেত্রেই হামেশা দেখা যাচ্ছে।
আলোচ্য নিবন্ধের লেখক নিজে শিক্ষক হয়েও ঢাকা শহরের শিক্ষকদের ফ্ল্যাট কেনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জাতি গড়ার কারিগরদের তিনি কোথায় বাস করা দেখতে চান? ইব্রাহিমপুরের টিনশেডে? নাকি আরো বাজে কোনো জায়গায়? যদি তা-ই হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষার মান কোনো দিনও ভালো হবে না। জাতি যদি শিক্ষকদের উন্নত জীবন দিতে পারে, গুলশান বনানীর মতো জায়গায় তাদের ফ্ল্যাট দিতে পারে, তাহলেই সারা দেশ একদিন গুলশান-বনানী হয়ে উঠতে পারে। যদি টিনশেডের বস্তিতে রাখেন, তাহলে আপনার সন্তানদের জিপিএ এনে দিতে পারলেও প্রকৃত শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন না। ফ্ল্যাটে থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে জাতিকে এখানে ছোট করা হয়েছে। কারণ, প্রশ্নটি এসেছে শিক্ষকদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা থেকে। যেমন- ‘শিক্ষকদের কেন গাড়ি-বাড়ি থাকবে?’ কিন’ যে শিক্ষকেরা জাতির বিবেক ও মস্তিষ্ক গড়ে, তাদের মস্তিষ্ক যদি ছাপোষা জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্ষয়ে যায়, শিক্ষার্থীরা তাদের কাছ থেকে কী মনোবল অর্জন করবে? শিক্ষকের কাছ থেকে কি শিক্ষার্থীরা শুধু বই পড়াই শেখে?
শহরাঞ্চলের রেজাল্ট ভালো হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এতে নেতিবাচক কিছু দেখার নেই। এটা খুব স্বাভাবিক, বিশ্বের সব রাজধানী শহরেই দেশের ভালো ভালো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থাকে। সেখানে ভালো ভালো শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়। আর শহরের প্রযুক্তি ও যোগাযোগের সব ধরনের মাধ্যম শিক্ষার্থীদের হাতের নাগালে, তাই সৃজনশীল প্রশ্নের এ যুগে শহরের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি আপডেটেড ও সচেতন হিসেবে গড়ে উঠছে। ফলে শিক্ষকদের, শিক্ষার্থীর ও তাদের বাবা-মায়েদের সচেতন ভূমিকায় ভালো ফল হতে পারে এবং গ্রামের তুলনায় দক্ষতর শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে উঠতেই পারে। তবে গ্রামেও মেধাবীরা যাতে শিক্ষক হিসেবে যেতে চায়, সরকারের উচিত সে ব্যবস’া করা।
শিক্ষাক্ষেত্রটাও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেবাক্ষেত্র বা সার্ভিস সেক্টরের মধ্যে পড়ে। তাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল যারা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করে থাকেন, তারা যদি নিয়মিত চাকরির পাশাপাশি বিকেলে নিজস্ব চেম্বারে সমাজসেবার জন্য বসতে পারেন, শিক্ষকরা কেন পারবেন না? শিক্ষকদের সেবাটা তো আরো নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজন এবং আরো সুদূরপ্রসারী ফলদায়ক। ডাক্তার শরীরের সেবা করেন, শিক্ষক মনের। একজন শিক্ষক শুধু একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন। তিনি পুরো সমাজের শিক্ষক। সবার জন্য একই আইন হওয়া উচিত। কিন’ তা বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক নয়। কারণ কেউ যদি হাসপাতালে বা বিদ্যালয়ে ঠিকমতো কাজ না করে, তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দায়ী। সরকারের উচিত বিদ্যালয় প্রশাসনকে আরো বেশি কিভাবে কার্যকর করা যায়, তার ব্যবস’া করা। সত্যি হচ্ছে, যে শিক্ষক ক্লাসরুমে ভালো পড়ান তার কাছেই শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে পড়তে যায়। বেতন না বাড়িয়ে, মর্যাদাপূর্ণ উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা তৈরি না করে, কোচিং বন্ধ করা হলে তাকে আরো বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক যন্ত্রণায় ফেলা হবে। এটা জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে কি? আর ন্যাশনাল কারিকুলামের শিক্ষকদের জন্য না হয় আইন করলেন, কিন’ ইন্টারন্যাশনাল কারিকুলামের শিক্ষকদের ব্যাপারে এমন; কী করবেন, তাও সরকারকে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে, ঢাকা শহর মানেই বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রাম নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোচিং বন্ধের উদাহরণ দিলেও আলোচ্য লেখক কিন’ বলেননি কোচিং বন্ধের আগে সরকার শিক্ষকদের কী কী সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে ও বেতন কী হারে বাড়িয়েছে। কোরিয়ার একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মাসিক আয় ন্যূনতম ১৮ লাখ থেকে ২৪ লাখ। এখন হিসাব করুন, আমাদের ও কোরিয়ার শিক্ষকদের বেতনের ব্যবধান। পাশের ভারতেও একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বাংলাদেশী টাকার ৩৬ হাজার টাকা মাসিক বেতন পান, যা আমাদের শিক্ষকদের চেয়ে সাড়ে চার গুণ। শিক্ষাক্ষেত্রে বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এ দুটি রাষ্ট্র ছাড়াও কোনো উন্নত দেশের কোথাও কোচিং বন্ধের কোনো আইন নেই। কোচিংয়ের বিরুদ্ধে আইন করা জরুরি নয়।
শিক্ষকদের বেতন না বাড়িয়ে কোচিং বন্ধ করার আইন যেন পাড়ার রাজনৈতিক বড় ভাই কর্তৃক নিরীহ ছেলেটির ওপর অহেতুক দাদাগিরি। অন্যভাবে বললে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। কিছু শিক্ষক অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক মানসিকতার হয়ে উঠতে পারেন। এখন যদি বলি এ জাতির সবচেয়ে ভালো মানুষগুলো কারা- মানুষ উত্তর দেবে ‘আমাদের শিক্ষকেরা’। মন্ত্রী মহোদয় কথাগুলো যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

About Khan Sarifuzzaman

Check Also

ভয়ের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় স্ববিরোধিতা

আমি ইউএনও অফিসে যাচ্ছি। কাজ সেরে ইনশাল্লাহ ফিরে  আসব।” কাঁদো কাঁদো কণ্ঠের উত্তর শোনা যায়। ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

xu hướng thời trangPhunuso.vnshop giày nữgiày lười nữgiày thể thao nữthời trang f5Responsive WordPress Themenha cap 4 nong thongiay cao gotgiay nu 2015mau biet thu deptoc dephouse beautifulgiay the thao nugiay luoi nutạp chí phụ nữhardware resourcesshop giày lườithời trang nam hàn quốcgiày hàn quốcgiày nam 2015shop giày onlineáo sơ mi hàn quốcshop thời trang nam nữdiễn đàn người tiêu dùngdiễn đàn thời tranggiày thể thao nữ hcmphụ kiện thời trang giá rẻ