TT Ads

 

খান শরীফুজ্জামান

দীর্ঘদিনের স্থবির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরবে বসন্তের হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। কিন্তু তা যেন গ্রীষ্মের খরতাপে মলিন হয়ে উঠছে। তিউনিসিয়া, মিসরের মানুষের ভাগ্যাকাশের কালোমেঘ কেটে এখনো পূর্ণিমার আলো ছড়ায়নি। আরব বসন্তের সুতিকাগার তিউনিসিয়ার মানুষ রাজধানী তিউনিসসহ সিলিয়ানা প্রদেশে ডিসেম্বরের প্রথম থেকে বেকারত্ব, দরিদ্রতা ও সরকার পতনের ডাক দিয়ে মডারেট ইসলামী সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে চলেছে। তিউনিসিয়ার সবচেয়ে বড় বামপন্থি শ্রমিক ইউনিয়ন তিউনিসিয়ার জেনারেল লেবার ইউনিয়ন (UGTT) তাদের শান্তিপূর্ণ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আন নাদাহ পার্টির বর্বর হামলার বিরুদ্ধে ১৩ ডিসেম্বর, ২০১২ সারাদেশে স্ট্রাইকের আহ্বান করে। তারা শ্লোগান দেয়, “বিদেশিদের আশীর্বাদপুষ্ট সরকার ক্ষমতা ছাড়”, “উপনিবেশবাদীদের সরকার, তোমরা তিউনিসিয়াকে বিক্রি করে দিয়েছ”। আন্দোলনের মুখে সিলিয়ানা প্রদেশের গভর্নরকে সরকার দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয়। আর এ স্ট্রাইকের আহ্বান স্মরণীয় এই ডিসেম্বরের মাঝে। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিদি বাউজিদ শহরে মোহাম্মদ বু আজিজি নামের এক যুবককে পুলিশ রাস্তায় ফল বিক্রি করতে না দেয়ার প্রতিবাদে তিনি নিজ শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দেন। তার এই আত্মাহুতির ঘটনা সমগ্র তিউনিসিয়ায় বেন আলী বিরোধী বিপ্লবের বীজ বপন করে। শেষ পর্যন্ত পতন হয় বেন আলীর।

দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট মুনসেফ মারজুকি সম্প্রতি শ্রমিক-কর্মচারীসহ সবার প্রতি আহ্বান জানান অন্তত ছয় মাসের জন্য ধর্মঘট বা আন্দোলন না করার জন্য। এছাড়া অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হামাদি জিবালি দেশটির অনুন্নত ও দারিদ্র্যকবলিত এলাকায় দ্রুত বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি তিনি কতটুকু রক্ষা করতে পারবেন তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কেননা, বিপ্ল¬বের কারণে বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা নেমে এসেছে তা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে শিল্পায়নের দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার পরই তিউনিসিয়ার অবস্থান। ২০১১ সালে দেশটিতে বেকারের সংখ্যা ছিল ছয় লাখের কিছু বেশি। বর্তমানে (২০১২) তা সাড়ে আট লাখে পৌঁছেছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৬ শতাংশ থাকলেও বছরের শেষ নাগাদ তা ১৯ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।

ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি আন নাদাহ পার্টির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতির নাজুক অবস্থা ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। মানুষ এখন দ্রুত পরিবর্তন দেখতে চায়। বেন আলীর শাসনামলের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের অবসান ঘটাতে নতুন সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সেদিকেই সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ। এছাড়া ইসলামপন্থিদের বিজয়কে এখনো মেনে নিতে পারেনি ধর্মনিরপেক্ষ মিডিয়া ও জনমতের একটি অংশ। তারা নতুন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে, যদিও আন নাদাহ পার্টি মধ্য বামপন্থিদের সাথে নিয়ে জোট সরকার গঠন করেছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা। এটিও সরকারের জন্য একটি সমস্যা। যেমনটি আমরা নির্বাচনে পরাজিত মিসরের বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই তিউনিসিয়ায় গড়ে ও বেড়ে উঠেছে আন নাদাহ পার্টি। ১৯৮১ সালে এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন রশিদ ঘানুশি ও অন্যান্য ইসলামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক। কিন্তু বেন আলীর ২৩ বছরের শাসনামলে দলটি তার কার্যক্রমই চালাতে পারেনি ঠিকমতো। ১৯৯০-এর দশকে আন নাদাহর ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার ও অনেককে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু বেন আলী সরকারের নিপীড়নের মধ্যেও আন নাদাহর সাংগঠনিক তত্পরতা ও বিস্তার অব্যাহত ছিল। যার প্রমাণ মিলেছে বেন আলীর পতনের পর আন নাদাহর অবিস্মরণীয় উত্থানে। নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি তার ভিত্তিকে প্রমাণ করে দিয়েছে। হাবিব বরগুইবা ও বেন আলীর অর্ধশতাব্দীর শাসনামলে কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। পশ্চিমাদের খুশি রাখতে ইসলামী কোনো দলকে প্রকাশ্যে তত্পরতাই চালাতে দেননি বরগুইবা ও বেন আলী। দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটি এখন তিউনিসিয়ার সরকার চালাচ্ছে। এটিও একটি বড় বিস্ময়। গত মার্চে (২০১২) আন নাদাহ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও চিন্তাবিদ ড. রশিদ ঘানুশি প্রভাবশালী এলিটদের নিয়ে ছোট্ট একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তিউনিসিয়ার সেন্টার ফর দি স্টাডি অব ইসলাম এন্ড ডেমোক্রেসির মিলনায়তনে। বিশ্ব মিডিয়াতে তার বক্তব্যগুলোকে ফলাও করে প্রচার করা হয়। কিন্তু কী ছিল তার বক্তব্যের মধ্যে! তার প্রধান বক্তব্য ছিল ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। ইসলাম সেক্যুলারিজমের সাথে একসাথে চলতে পারে। অর্থাত্ গণতন্ত্র ও ইসলামের মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি আদর্শের ওকালতি করেন তিনি। তিনি বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা আবির্ভূত হয়েছে, বেড়ে উঠেছে এবং পশ্চিমে প্রতিভাত হয়েছে ক্রিয়াবিধিগত সমাধান হিসেবে। কোনো দর্শন ও অস্তিত্ববাদী তত্ত্বের প্রেক্ষিতে নয়। ইউরোপের সমস্যা সমাধান হিসেবে জন্মগ্রহণ করে ধর্মনিরপেক্ষতা।” তার এ বক্তব্যের পর তাকে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বিশ্লেষক “ইসলামী সেক্যুলার” বলে অভিহিত করেছেন। ২০০৬ সালে হামাসের জয়ের পর থেকে তিউনিসিয়ায় আন নাদাহ পার্টির বিজয়, মিসরের ব্রাদারহুডের বিজয়, মরক্কো, তুরস্কে ইসলামপন্থিদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মুসলিম উম্মাহ ইসলাম দিয়ে শাসিত হতে চায়। শুধু নির্বাচন ব্যবস্থাকে তারা গ্রহণ করেছে প্রতিনিধিত্বশীল নেতা নির্বাচনের ‘উপকরণ’ হিসাবে। আর শুধু নির্বাচন মানে যে গণতন্ত্র নয়, তা মুরসি-জিবালিরাও জানেন। ওবামাও জানেন। নির্বাচনকে নেতা নির্বাচনের উপকরণ হিসেবে মুসলিমরা মানলেও পশ্চিমা ‘মানুষের তৈরি আইনে’র সেক্যুলার গণতন্ত্রকে ধার্মিক মুসলিমরা কখনো মানে না।

শেষে বলা যায়, অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি মডারেট হিসাবে পরিচিত নাদাহ পার্টি রাজনৈতিক কোন আদর্শে দেশ গড়বে তাও একটি চ্যালেজ্ঞের বিষয়। কারণ, যে সাধারণ মানুষ আন নাদাহ পার্টিকে একটি শুদ্ধ ইসলামী ব্যবস্থার জন্য ভোট দিয়েছে। ২০১৩ সালের নির্বাচনের জন্য জনগণের কাছেই দলটিকে তার ইসলামী সেনসেশন নিয়ে ফিরে যেতে হবে।

লেখক: মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

shoheldu412@gmail.com

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *
You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>